Skip to main content
Bangladesh

হলুদ পাতায় সুপ্ত অতীত: স্মৃতির আলমারিতে বন্দি নিখাদ প্রেম

চিঠি দিও, প্রতিদিন, চিঠি দিও। একসময় সুরের ভুবন থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সবখানেই ছিল চিঠির জয়জয়কার।

Byশুভ্র অরণ্য· Contributor

2 min read

Photo:

চিঠি দিও, প্রতিদিন, চিঠি দিও। একসময় সুরের ভুবন থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সবখানেই ছিল চিঠির জয়জয়কার। চিঠি নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য গান, রচিত হয়েছে মহাকাব্যিক সব প্রেম কাহিনি। চিঠি তো কেবল এক টুকরো কাগজ কিংবা খানিকটা নীলচে-কালো কালি দিয়ে লেখা কিছু বাক্য ছিল না, তার ভেতরে পরম যত্নে বুনে দেওয়া থাকতো এক পৃথিবীর সব আবেগ, ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা।

আজকের ডিজিটাল সময়ের ঝলমলে আলোর টেক্সট আর ই-মেইলের যুগে আমরা হয়ত দ্রুত যোগাযোগ করতে শিখেছি, কিন্তু শব্দের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সেই দীর্ঘশ্বাস আর আকুলতা প্রকাশে আধুনিক মাধ্যমগুলো বড্ড ব্যর্থ। স্পর্শের অনুভব ও পত্র মিতালীর সেই সোনালি দিন আজ আর নেই। চিঠি ছিল একেকটি জীবন্ত অনুভব, একেকটি প্রাণের সতেজ সঞ্চার। প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ পাওয়া সেই কাগজের পরশ, তার হাতের লেখার ভাঁজ আর খামের ভেতরে জমাট বাঁধা অনুভূতি— এসবের দেখা আজকের মেসেঞ্জারের শুকনো হরফে মেলে না।

একসময় অচেনা মানুষের সাথে সুদূর পথ অতিক্রম করে বন্ধুত্ব স্থাপনের প্রধান অবলম্বন ছিল এই চিঠি, যা তৎকালীন সমাজে 'পত্রমিতালি' বা 'পেন পল' নামে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিল। অপেক্ষার ভেতর যে কত অসম্ভব সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিল, তা চিঠির চেয়ে বেশি আর কে জানে!

বহুদূরে থাকা সন্তানের জন্য মায়ের আকুল প্রার্থনা মাখা চিঠি, ভিনদেশ থেকে আসা তরুণ যুবকের চাকরির আশার বাণী, কিংবা খামের কোনায় চোখের জলে ভিজিয়ে রাখা দুঃখের খবর- সবই পৌঁছে দিত সেই খাকি পোশাকের ডাকপিওন।

মৃত্যু সংবাদ নিয়ে আসা কোনো চিঠি যেমন পুরো পরিবারে নামিয়ে আনতো নীরব স্থবিরতা ও শোকের ছায়া, তেমনি প্রথম ভালোবাসার এক লাইনের মোড়ানো খাম এনে দিত বসন্তের মাতাল হাওয়া।

শুধু অদেখা বা সুদূরের মানুষের সাথেই নয়, যে সব প্রেমী দম্পতি বা গোপন ভালোবাসার মানুষের প্রতিদিন দেখা হতো, তারাও প্রিয়তমের হাতে গুঁজে দিত নীল খামে মোড়ানো চিঠি। মুখে বলতে না পারা হাজারো অনুভূতির মেঘগুলো হরফ হয়ে ঝরে পড়তো কেবল সেই সাদা কাগজে।

শুভেচ্ছা বার্তা, পরম স্বজনের ভালো থাকার খবর, কিংবা প্রিয়জনের জন্য পাঠানো মানি অর্ডার- সবকিছুর নীরব সাক্ষী ছিল এককালের ডাকবাক্সগুলো। কিন্তু আজ আর বাড়ির গেটে সেই লাল কিংবা লোহার চিঠির বাক্সের অস্তিত্ব দেখা যায় না। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শুনে বুক কেঁপে ওঠার সেই চেনা রোমাঞ্চ হারিয়ে গেছে ধূসর অতীতে।

প্রযুক্তির দাপটে আজ হয়ত কথা বেড়েছে, কিন্তু কমেছে অনুভূতির গভীরতা। দাপ্তরিক কিছু শুষ্ক কাগজ ছাড়া এখন আর ভালোবাসার সুবাস নিয়ে কারও দরজায় চিঠি আসে না। হলুদ হয়ে যাওয়া পুরোনো কিছু চিঠির ফ্রেমে কিংবা আলমারির গোপন কোণেই কেবল আজ সুপ্ত হয়ে বেঁচে আছে একসময়ের সেই নিখাদ প্রেম।

Share

Related Stories

First published 20 September 2026. Spotted an error? Read our corrections policy.