Skip to main content
The Inscript
World

সীমান্তে গুলির শব্দ: বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে প্রাণহানি কতটা স্বাভাবিক?

ByMd Tuhin· Editor & National Affairs Correspondent

5 min read

Photo:

দুই দেশের সীমান্ত মানেই নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ, অবৈধ পারাপার ও চোরাচালান ঠেকানোর কঠিন দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের মাঝেই যখন বারবার মানুষের প্রাণ যায়, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে—সীমান্ত রক্ষা কি মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে?

বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৪,১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে বছরের পর বছর ধরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী BSF-এর গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা। তবে সীমান্তে ঘটে যাওয়া প্রতিটি মৃত্যুকে একই ধরনের ঘটনা হিসেবে দেখাও সঠিক নয়। কোথাও গুলির ঘটনা, কোথাও নির্যাতন, কোথাও ধাওয়া করতে গিয়ে মৃত্যু, আবার কোথাও সীমান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত সংঘর্ষের ঘটনাও রয়েছে।

তাই প্রশ্নটি শুধু কতজন মারা গেছে—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কী পরিস্থিতিতে এসব মৃত্যু ঘটেছে, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা কতটা প্রয়োজনীয় ছিল এবং এসব ঘটনার কতগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে?

সংখ্যার দিকে তাকালে

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে ১৯৭১ সালের পর থেকে নিহতদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও দুই দেশের সম্মত সরকারি তালিকা নেই। ফলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।

তবে অতীতের তথ্য পরিস্থিতির ব্যাপ্তি বোঝায়। Human Rights Watch-এর ২০১০ সালের একটি অনুসন্ধানে Odhikar-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৩০-এর বেশি বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্ত এলাকায় BSF-এর হাতে নিহত হয়েছেন।

অর্থাৎ এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই নিহতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছিল। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এমন পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

সাম্প্রতিক বছরেও কি পরিস্থিতি বদলেছে?

সময় গড়ানোর সঙ্গে সীমান্তে প্রাণহানির সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়। তবে ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ২৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্ত এলাকায় BSF-এর গুলি বা নির্যাতনে নিহত হন। এর মধ্যে ২০ জন গুলিতে এবং ৮ জন নির্যাতনে মারা যাওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।

একই সময়ে আরও ৩৭ জন আহত হয়েছেন বলে ASK-এর নথিতে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া আটক বা অপহরণের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

২০২৬ সালেও সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ASK-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৯ মে পর্যন্ত অন্তত ৬ জন বাংলাদেশি BSF-এর গুলি বা নির্যাতনে নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে Human Rights Watch-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে এবং অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

তাহলে কি সীমান্তে গুলি করা স্বাভাবিক?

এখানেই মূল প্রশ্ন।

সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক, গবাদিপশু পাচারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ঘটতে পারে। এসব প্রতিরোধ করা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব। কিন্তু কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজন হলেই তাকে গুলি করে হত্যা করা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না।

Human Rights Watch-এর ২০১০ সালের বিস্তৃত অনুসন্ধানে বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, নির্যাতন, আটক ও হত্যার বহু ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে এমন ঘটনাও উল্লেখ করা হয়, যেখানে কথিত অপরাধের তুলনায় বলপ্রয়োগের মাত্রা ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

অর্থাৎ সীমান্তে অপরাধ দমন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু অপরাধ দমনের পদ্ধতি যদি এমন হয় যে একজন নিরস্ত্র মানুষও প্রাণ হারাতে পারেন, তাহলে সেই পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা, বৈধতা এবং proportionality নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

একজন সীমান্তবাসীর কাছে সীমান্ত কেমন?

ঢাকার মতো কোনো শহুরে এলাকায় বসে সীমান্তকে হয়তো একটি মানচিত্রের রেখা মনে হতে পারে। কিন্তু সীমান্তবর্তী মানুষের কাছে সেটিই তাদের বাড়ির পাশের মাঠ, রাস্তা, নদী কিংবা কৃষিজমি।

অনেক সীমান্তবাসীর জীবন-জীবিকা দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তকেন্দ্রিক। সেখানে একটি গুলির ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।

একজন সন্তান হারায় তার বাবা বা মাকে। একজন স্ত্রী হারান পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষকে। একটি পরিবার হঠাৎ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

তাই সীমান্তে প্রতিটি মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি জীবন এবং অনেকগুলো অসমাপ্ত গল্প।

তবে বাংলাদেশের দায় কি নেই?

একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদনে এই প্রশ্নটিও থাকা জরুরি।

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ পারাপার এবং অন্যান্য সীমান্ত অপরাধ বাস্তব সমস্যা। এসব প্রতিরোধে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী BGB-এরও দায়িত্ব রয়েছে। সীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তাই পুরো বিষয়টিকে কেবল একটি পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাস্তবতার সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন হলো, অপরাধ প্রতিরোধ করতে গিয়ে প্রাণঘাতী শক্তি কি সত্যিই শেষ উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যবহার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে যাচ্ছে?

এই প্রশ্ন শুধু ভারতের BSF-এর ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশের BGB-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ভারতীয় নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় থাকা উচিত

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে ভারতীয় নাগরিক এবং সীমান্তরক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাই বিষয়টিকে একতরফাভাবে উপস্থাপন না করে দুই দেশের নাগরিক ও সীমান্তরক্ষীদের মৃত্যুর তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও মানবাধিকার সংগঠন নিহতের হিসাব তৈরির সময় ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা, সময়সীমা ও তথ্যের উৎস ব্যবহার করেছে।

ফলে ১৯৭১ সাল থেকে ঠিক কতজন বাংলাদেশি এবং কতজন ভারতীয় সীমান্তে নিহত হয়েছেন—এমন একটি একক চূড়ান্ত সংখ্যা দাবি করার আগে প্রতিটি উৎসের তথ্য একই পদ্ধতিতে যাচাই করা জরুরি।

একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করে এই সতর্কতার ওপর।

প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু মৃত্যু কেন থামে না?

সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত বহুবার আলোচনা করেছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, অপরাধ দমন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কমানোর বিষয়ও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

তারপরও সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

এখানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।

সীমান্ত অপরাধ কি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে?

সীমান্তরক্ষীদের জন্য নির্ধারিত Rules of Engagement কতটা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে?

প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় কি স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হচ্ছে?

কোনো বাহিনীর সদস্য বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে কি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট না হলে সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ করা কঠিন।

সীমান্তে নিরাপত্তা চাই, কিন্তু মৃত্যুর স্বাভাবিকীকরণ নয়

একটি রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা করার অধিকার আছে। সীমান্তে আইন প্রয়োগেরও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব।

অবৈধ পারাপার ঠেকানো সম্ভব।

সীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব।

কিন্তু এসব মোকাবিলায় প্রতিটি পরিস্থিতিতে গুলি চালানোই একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি নিরস্ত্র হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণঘাতী হুমকি তৈরি না করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

শেষ প্রশ্ন

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক শুধু দুই সরকারের সম্পর্ক নয়। এটি দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের সম্পর্ক।

সীমান্তে শান্তি থাকলে সীমান্তবর্তী মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারেন। স্বাভাবিক হয় তাদের জীবন ও জীবিকা। কিন্তু সীমান্তে যদি গুলির শব্দ বারবার ফিরে আসে, তাহলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তাই প্রশ্নটি খুব সরল—

একজন মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছে, অথবা কোনো অপরাধে জড়িত—এই অভিযোগের জবাব কি তার মৃত্যু হতে পারে?

যদি উত্তর না হয়, তাহলে দুই দেশেরই দায়িত্ব এমন একটি সীমান্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে অপরাধ দমন হবে, সীমান্ত সুরক্ষিত থাকবে এবং একই সঙ্গে মানুষের জীবনও সুরক্ষিত থাকবে।

কারণ সীমান্তের এপারে বা ওপারে পরিচয় আলাদা হতে পারে। কিন্তু গুলির সামনে সবাই প্রথমে একজন মানুষ।

Share

Md Tuhin

Editor & National Affairs Correspondent · Dhaka, Bangladesh

Md Tuhin leads The Inscript newsroom and writes on national affairs and politics, with a focus on governance, public spending and parliamentary accountability.

Related Stories

First published 12 September 2026. Spotted an error? Read our corrections policy.